ট্রাম্পের অভিবাসননীতি

বিদেশী কর্মী সংকটে শ্লথ হতে পারে মার্কিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

একসময় ‘অভিবাসীবান্ধব’ দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র।

একসময় ‘অভিবাসীবান্ধব’ দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসননীতির ফলে সে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। ট্রাম্প বাস্তবায়িত নীতির কারণে দেশটির শ্রমবাজারের বিদেশী কর্মীনির্ভর দক্ষ-অদক্ষ সব খাতই প্রভাবিত হচ্ছে। এতে শ্রম সংকট, মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদনে ব্যাঘাত এবং শ্লথ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন তারা। খবর এপি।

ফ্লোরিডার একটি স্কুলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন মারিয়া। ঘণ্টাপ্রতি আয় ছিল ১৩ ডলার। প্রতি দুই সপ্তাহে তিনি ৯০০ ডলারের একটি চেক পেতেন। কিন্তু আগস্টের এক সকালে জানতে পারেন তার চাকরি নেই। কারণ জো বাইডেন আমলের মানবিক প্যারোল কর্মসূচি বাতিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ কর্মসূচির আওতায় কিউবা, হাইতি, ভেনিজুয়েলা ও নিকারাগুয়া থেকে আসা মানুষ বৈধভাবে কাজের অনুমতি পেত।

ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাত্র ৫ ডলার আছে বলে জানান ৪৮ বছর বয়সী এ নারী। অভিবাসীদের ওপর ব্যাপক দমন অভিযান এখন মারিয়ার মতো বিদেশীদের শ্রমবাজারচ্যুত করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে দোলাচল তৈরি করছে। এছাড়া এমন সময়ে বিদেশীরা অচ্ছ্যুত হয়ে পড়ছেন, যখন ট্রাম্পের অস্থির বাণিজ্যনীতির কারণে দেশটিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়েছে।

সাধারণত মার্কিন বংশোদ্ভূতরা কম মজুরির কাজ করতে চান না। ঘরবাড়ি পরিষ্কার, টমেটো তোলা ও বেড়া রঙের মতো কাজ নিম্নশিক্ষিত অভিবাসীদেরই জোটে। প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর জন্যও বিদেশের ওপর নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে জটিলতা তৈরি করেছেন ট্রাম্প। অর্থাৎ কম মজুরির শ্রমিকদের দেশ থেকে তাড়াচ্ছেন, অন্যদিকে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশীদের যুক্তরাষ্ট্রে আসতে নিরুৎসাহিত করছেন। ফলে শ্রমবাজারে ঘাটতি কমিয়ে মজুরি ও মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তাকারী বিদেশী শ্রমপ্রবাহ থেমে যাচ্ছে।

কার্নেগি-মেলন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ লি ব্র্যানস্টেটার বলেন, ‘অভিবাসীরা অর্থনীতির জন্য উপকারী। অভিবাসন বেড়েছিল বলে গত পাঁচ বছরে মূল্যস্ফীতির চাপ অনেক কম ছিল।’

অর্থনীতিবিদদের মতে, বেশি কর্মী মানে বেশি চাকরি, বেশি আয়ের সুযোগ ও বেশি খরচ। এ চক্র সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করেছে। এখন ব্যাপক বহিষ্কার ও বৈধ অভিবাসন সীমিত করার চেষ্টা উল্টো ফল দেবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন ও আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের যৌথ প্রতিবেদন অনুসারে বিদেশী কর্মী হারালে কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মাসিক কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্য বা ঋণাত্মক হতে পারে।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নিয়োগের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। জুন-আগস্ট পর্যন্ত মাসে গড়ে ২৯ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ২০২১-২৩ সালে প্রতি মাসে চার লাখ চাকরি তৈরি হয়েছিল।

সম্প্রতি ২০২৫ সালের জন্য মার্কিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নিম্নমুখী সংশোধন করেছেন নির্দলীয় কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস। এর পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে ট্রাম্পের অভিবাসন ও বাণিজ্যনীতি। প্রতিবেদনে জিডিপি পূর্বাভাস ২ দশমিক ৫ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা গত বছরের ২ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি থেকে অনেক কম।

বয়স্কদের আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও হসপিস সুবিধা দেয় ভার্জিনিয়ার আলেক্সান্দ্রিয়াভিত্তিক গুডউইন লিভিং। যেখানে দেড় হাজার কর্মীর ৬০ শতাংশই বিদেশী। ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পর চারজন হাইতিয়ান কর্মীকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি। এ কর্মীরা মানবিক প্যারোল কর্মসূচির আওতায় কাজ করতেন। আরো ৬০ জন অভিবাসী কর্মী তাদের অস্থায়ী বৈধ কাজের অধিকার হারাতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী রব লাইব্রিচ।

দক্ষিণ সীমান্তে ‘অবৈধ আগ্রাসন রোধ’ ও চাকরিতে মার্কিনদের অগ্রাধিকার দেয়াকে অভিবাসন নীতির লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বছরে ১০ লাখ অভিবাসী বহিষ্কার খুব ব্যয়বহুল ও জটিল কাজ হওয়ায় এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ ছিল। কিন্তু জুলাইয়ে ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিলে’ ট্রাম্পের স্বাক্ষরের পর সে পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে। নতুন আইনে অভিবাসন দমনে ১৫ হাজার কোটি ডলার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের সমর্থকদের বড় একটি অংশ কৃষক। কিন্তু অভিবাসীবিরোধী অভিযানের ফলে তারাই কর্মীসংকটে পড়ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফসলের মূল্যহ্রাস, খরচ বৃদ্ধি ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব। মার্কিন শ্রম মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক নথিতে স্বীকার করেছে এ দমননীতি কৃষিতে শ্রম সংকট তৈরি করছে, যা পরবর্তী সময়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়াতে পারে।

ট্রাম্পের অভিবাসননীতির সর্বশেষ পদক্ষেপ হলো এইচ-১বি ভিসার জন্য ১ লাখ ডলার ফি, যা আগে ছিল ২১৫ ডলার। বিদেশী দক্ষ কর্মীদের আকর্ষণে ব্যবহৃত এ ভিসা নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মার্কিন প্রযুক্তি খাত।

গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ড্যানি বাহার বলেন, ‘১ লাখ ডলারের ভিসা ফি শুধু প্রশাসনিক খরচ নয়। এটি এক ধরনের বার্তা, ইউ আর নট ওয়েলকাম হেয়ার।’

গত মাসে অভিবাসন কর্মকর্তারা জর্জিয়ার একটি হুন্দাই ব্যাটারি কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৩০০ দক্ষিণ কোরীয় কর্মীকে আটক করে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে হাতকড়া পরানো হয়। এসব কর্মী ছিলেন কারখানা চালু করার মূল বিশেষজ্ঞ দলের অংশ। এ প্রযুক্তিগত দক্ষতা মার্কিনদের নেই। ঘটনাটি দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং ট্রাম্পের বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং।

আরও